মুহাম্মদ সায়েস্তা মিয়াঃ স্বনির্ভরতা আছে কিন্তু কাঙ্খিত উন্নয়ন নেই। দেশ স্বাধীনের আজ ৫০ বছরে পা। ধিরে ধিরে দেশের সব জনপদই উন্নয়ন পেয়েছে কম বেশি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে আজ বাহন চলে। কিন্তু যদি বলি এ গ্রামের মানুষ আজও রাস্তা পায়নি হয়তো বিশ্বাস হবে না, কিন্তু তাই সত্য।
গ্রামাঞ্চলের উন্নয়ন নির্ভর করে স্থানীয় মানুষের উপর। ওরা কতটুকু শিক্ষিত, কতটুকু কর্মট, কতটুকু আধুনিক, কেমন তাদের রুচিবোধ এ সব বিবেচ্য বিষয়ের উপর। এই গ্রামে সব ধরণের মানুষ আছে, আছে উচ্চ শিক্ষিত, আছে প্রবাসী, আছে শ্রমজীবী, মজুর, কৃষক, রাজনীতিবিদ সহ নানান পেশার। তবে কেন এই গ্রাম এতো অবহেলিত। এই প্রশ্নের জবাবে উত্তর আসবে অগণিত কিন্তু সমাধান হবে না তাতে। চাইলে গ্রামের প্রবাসীরাই উন্নয়নে ভাসিয়ে দিতে পারতেন। যে দু-চারজনের সহায় সম্ভল আছে তারা এ নিয়ে মাথা ঘামান না, অথবা যারা রাজনীতি করেন তারাও মনযোগ দিয়ে উদ্যোগ নেন না। আবার জনপ্রতিনিধিদের বারংবার মিথ্যা আশ্বাসের কারণে এই গ্রামের মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে, কার কাছে যাবে বলে।
এই গ্রামের মানুষ আজও কঠিন বিপদ আপদে সনাতনী পদ্ধতি ছাড়া ভরসা করার কোন বিকল্প পান না খুঁজে। বৃদ্ধ, প্রসূতি, হঠাৎ দূর্ঘটনায় আক্রান্ত যে কাউকে চিকিৎসার জন্য পোহাতে হয় সীমাহীন দূর্ভোগ। রোগীকে পলো দিয়ে কিংবা খাট চৌকি দিয়ে কাঁধে বহন করে নিয়ে যেতে হয় হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে। এতে অনেক সময় রোগীদের জীবনাবসান হয়। দেরিতে ডাক্তারে পৌছার মাসূল হয় চোখের জলে বুক ভেজানো আর পাহাড়সম মনোকষ্টের গ্লানী আজীবন বয়ে চলে মূচড়ে ও ভেঙ্গে পড়ার মত। অথচ পূর্ব পশ্চিম লম্বা সিলেট ছাতক রেল-লাইন ঘেষা খাজাঞ্চী নদীর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এই গ্রাম থেকে পূর্বে অর্ধ কিলোমিটার দূর (বর্তমানে রাস্তা পাকা করণের কাজ চলমান) এবং পশ্চিমে সোয়া এক কিলোমিটার দূরে স্থানীয় পাকা রাস্তা রয়েছে। এই গ্রাম পর্যন্ত কাঁচা রাস্তায় মাটি ভরাট এবং পাকা করণ কাজটি যে কোন ইউনিয়নের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই বাস্তবায়ন করতে পারতেন। কিন্তু তারা কেউ এই কাজগুলো করেন না। নির্বাচন এলে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট আদায়ের পর আর কোন জনপ্রতিনিধিকে ধারে কাছে খোঁজে পাওয়া যায় না। দেশের অন্যান্য জনপদের সাথে সমান তালে উন্নয়ন ও উন্নীত করতে এখানে একটি কমিউনিটি হাসপাতাল এবং পাকা রাস্তা নির্মাণ অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে।
এই গ্রামের প্রায় অর্ধেক মানুষ পেশায় কৃষক। ধান ও শাক সবজী উৎপাদন করেন অত্যাধিক। ধানচাষে আধুনিকতা নেই বললে চলে। যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণ কারণে মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের এই গ্রামে আসতে কারো চোখে পড়েনা। রবি মৌসুমের পুরোটাই জুড়ে আবাদী শাক সবজী কৃষকেরা কাঁধে বয়ে নিয়ে যান হাট বাজারে। স্থানীয় কৃষকের চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষের চাহিদার যোগান হয় এখানকার উৎপাদিত তরি-তরকারিতে। কাঁচামাল সময় মত হাটে-বাজারে নিয়ে যেতে না পারলে কাঙ্খিত মূল্য পাওয়ার আশা করা যায় না। তাতে উৎপাদনের খরচ আর লভ্যাংশ নিয়ে হিসেব নিকেশ করে দিনের যোগান দিনে করে জীবন চলে যাচ্ছে আজীবন কষ্টে থাকা কৃষকের। দূর্ভাগা এই কৃষকদের দেখে কারো মায়া লাগে না কখনো। সময়ের ব্যঘাতের সাথে অধিক শ্রমে মানুষ হয়ে পড়ছে দিন দিন কাতর।
শিক্ষা ব্যবস্থায় আছে ভাটা। কোমলমতি শিশুরা দূরগায়ে গিয়ে স্কুল কামাই করে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছাড়া সরকারী ভাবে স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা রয়েছে অপ্রতুল। গ্রামে দুটি মসজিদ আছে অথচ সরকারী বরাদ্ধ কখনো পেয়েছে বলে জানা যায়না। নেই বয়স্ক কিংবা বাল্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত কোন কার্যক্রম। এখানে এখনো শতকরা ০৫% লোক স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন নয়। একটি স্বাক্ষর দিতে হলে কলম ভাঙ্গে হাতের ছাপে।
বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তিগত বঞ্চণার যাতাকলে গ্রামের মানুষ পৃষ্ট। মোবাইল নেটওয়ার্ক এতই দূর্ভল যে ঘরের ছাঁদে উঠে থ্রিজি ও ফোর-জি কে ডেকে আনতে হয়। কিন্তু মহামারী করোনার এই সময়ে কিংবা অন্য যে কোন সময়ে সরকারী বে-সরকারী ডিজিটাল যে কোন সেবা গ্রহনের ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। মোবাইল বা কম্পিউটারে ঘরে বসে পরীক্ষা প্রস্তুতি তথ্য আদান প্রদানে পিছিয়ে পড়েছে এই গ্রামের মানুষ। বহুদিন পরে বিগত দুই বছর আগে বিদ্যুৎ না পাওয়ার কলঙ্ক থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে সবাই। এখন সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু বিদ্যুতের সুফল ভোগ করতে পারছেন না অনেকেই। শিশুদের মননের বিকাশ সাধনে এখানে কোন খেলার মাঠ নেই। খেলার মাঠ ও তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে মোবাইল নেটওয়ার্ক, রাস্তা, স্যানিটেশন, বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র, কৃষকদের উন্নয়নে মাঠ পর্যায়ে কৃষি পরামর্শ, গবাদিপশু পালনে দক্ষতা প্রশিক্ষণ, সামাজিক অবক্ষয় রোধে প্রশাসনিক নজরদারির আওতায় এনে এই গ্রামকে এখনই স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে না পারলে জনম জনম বতসীবাসীদের কষ্ট পোহাতে হবে।
সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ২নং খাজাঞ্চী ইউনিয়নে অবস্থিত পাকিছির গ্রামের মানুষ আধুনিক সুযোগ সুবিধা চায়। অবহেলার খাতা থেকে মুছে ফেলতে চায় গ্রামের নামকে। সমপযোগী উন্নয়নের জোয়ারে ভাসতে চায় তারা, কিন্তু কে দেবে তাদের এই অসুবিধাকে সুবিধা করে।
এই অপবাদ ঘুঁচাতে হবে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সুনজর দিতে হবে এই গ্রামের উপর।
© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।