রাকিব হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার গ্রামপুলিশের ছেলে সাইদুল ইসলাম ৪১তম বিসিএস ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।গত ৩ আগষ্ট বৃহস্পতিবার সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) বিসিএসের চুড়ান্ত ফলাফলে এ তথ্য দেখা যায়। এর আগে সাইদুল ইসলাম পাটগ্রাম উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত ছিলেন। তার বাবা ঈমানআলী দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ ও মা গৃহিনী। অভাব অনটন থেকে বড় হওয়া সাইদুল ইসলাম ৪১ তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হওয়ায় পরিবার সহ দহগ্রাম ইউনিয়ন বাসীর মধ্যে ব্যাপক আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দহগ্রাম ইউনিয়ন চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, গুণিজন ও যুবসমাজ সাইদুল ইসলামকে শুভকামনা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করা মোঃ সাইদুল ইসলাম তার নিজস্ব ফেইসবুক আইডিতে পরিবার ও যারা তাকে শুভকামনা জানিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে লিখেন,
”আলহামদুলিল্লাহ। সকল প্রশংসা আল্লাহর। ৪১ তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। এটা বলা সহজ হলো কিন্তু এর মানেটা সহজ নয়। জীবনের পরতে পরতে সংগ্রামটা সম্ভবত আমার জন্মের পর থেকে শুরু হয়েছে। কিন্তু আমি ভাগ্যবান যে আমার বাবা-মা আমার সাথে সার্বক্ষণিক আছেন। আছেন সাফিউল ইসলাম এর মতো একজন ভাই। বলা হয় না, নদীর একূল ভেঙ্গে ওকূল গড়ে। সাফিউল ভাইয়াকেও মনে হয় তেমনি। নিজেকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে আমাকে গড়েছেন। আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও আমাকে সাহায্য করেছেন। অভাব ছিলো সত্য কিন্তু কোনোদিন কার্পণ্য ছিলো না। আমার বাবা একজন গ্রামপুলিশ হিসেবে কর্মরত আছেন।কিন্তু তিনি তাঁর দুরদর্শি চিন্তা আর একাট্টা সিদ্ধান্ত এমনভাবে অনুসরণ করেছেন যে, জীবনে কখনও থেমে যাওয়ার চিন্তা করেননি, এখনও নয়। বাবা অসুস্থ, বাবার জন্য দোয়া চাই। আমার মা দুনিয়ার সবচেয়ে সরল মানুষদের একজন। তাকে সারাজীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যেতে দেখছি। এখনও আমার মা আমাদের বাড়ির প্রাণ। তিনি ছাড়া সব কিছু শুন্য মনে হয়৷ পরিবার আছে বলেই আমি নিশ্চিন্তে আমাকে বিলিয়ে দিতে পারি। আর তারাও আমাকে গ্রহণ করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকে।
আমি একটা জিনিস দেখেছি: গ্রামে, শহরে, আমার বন্ধু- বান্ধব, বড় ভাই, ছোট ভাই বা আমার পরিবেশের ভেতরের প্রত্যেকটা মানুষ আমাকে খুব ভালোবাসে এবং পছন্দ করে। সবাই আমার জন্য দোয়া করে। হয়তো সে কারণে আল্লাহও আমাকে পছন্দ করেন। আমি প্রতিটি মুহূর্তে সবার দোয়া পেয়েছি, আর সবাই আমার জীবনে ভালো কিছু হোক সেটা নিয়ে কেন যেন নির্দ্বিধায় বলে ফেলত। আমার আজকের প্রাপ্তির জন্য এই মানুষগুলোর দোয়া যে আমাকে এতোদূর নিয়ে এসেছে, তাতে বিশ্বাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যে অনুভূতি হয়। সকলের প্রতি আমার চিরন্তন কৃতজ্ঞতা।
আমার স্কুল জীবন, কলেজ জীবন, বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরি জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি মানুষের কাছ থেকে আমার অজান্তে সহযোগিতা পেয়ে গিয়েছি।আগেই বলেছি আমার অভাব ছিলো, কিন্তু কখনও কোথাও আটকাইনি। কেউ না কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাকে মানসিকভাবে, আর্থিকভাবে বলতে গেলে সবদিক থেকে এই মহান মানুষগুলোর সহযোগিতা পেয়েছি।
রায়হান আরিফুর রহমান ভাই আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একজন সেরা মানুষ। আজকে তাঁর কথা বলতে চাই: ভোলার চরফ্যাশন আর লালমনিরহাটের দহগ্রাম দুই বিপরীত দিকে দুই স্থান। উত্তর-দক্ষিণ। তখন রিজিওনাল পলিটিক্সের শিকার হচ্ছিলাম। তখনই ভাই আমাকে তুলে আনলেন, স্থান দিলেন। আমি আবার স্বাভাবিক জীবন শুরু করলাম। আজকের দিনে ভাইকে মনে পড়ছে।
লাইনচ্যূত বগির মতো রেল লাইনে আবার চলা শুরু হলো। আমারে রুধিবে কে! শত বাঁধা-বিপত্তি, অভাব-অনটন পিছনে পড়ে গেলো ঠিকই ‘করোনা কাল’ এসে আবার আমাদের জীবনকে ছন্নছাড়া করে দিলো। কিন্তু একটা সুবিধাও হলো, ‘ডু অর ডাই’ চেতনা কাজ করলো। মেসে থাকলাম, পড়লাম, বিসিএসের একটা প্যানিক ভর করেছিলো। কিন্তু প্যানিকের সময়টা যে এতো দীর্ঘ, তাতে ধৈর্য ধরা ছাড়া কিছুই করার নেই। ‘ইন্নাল্লাহা মা আস সয়াবিরিন’ এটাকে বাস্তবায়িত করতে হয়।
কিন্তু পেটকে, বাস্তবকে ধৈর্য ধরানো যায় না। তার চাহিদা টাইম টু টাইম।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে উপজেলায় মেধা তালিকায় প্রথম হলাম। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৭ তারিখ সন্ধ্যায় রেজাল্ট দিলো। আমার মোবাইল মেসেজে শুধু একটা নাম্বার এসেছে, সেখানে লেখা ‘ইউ…’। আমি বুঝলাম যে আমার চাকরির রেজাল্ট হয়েছে। চাকরিটা হয়েছে। রেজাল্ট দেখে বালিশ চাপা দিয়ে ১০ মিনিট শুধু কাঁদছি। সূর্যসেন হলে ৫২০ নাম্বার রুমের দরজার সিটকিনি আটকে দিলাম, তারপর বালিশ চাপা দিয়ে কাঁদলাম, যাতে কান্নার শব্দ বাইরে না আসে। সব সময় চোখের সামনে ভাসলো, এখন আমার অসুস্থ বাবার চিকিৎসা করাতে পারবো। নিজেও ভালোভাবে বাঁচতে পারবো। বেকারত্বের শেষ বছর সত্যি আমার জন্য কঠিন সময় ছিলো। বাবাকে ফোন দিলাম, আমি শুধু কাঁদছি চাকরির কথা বলতে পারলাম না। সাফিউল ভাইয়াকে ফোন দিলাম, আমি কাঁদছি। ভাইয়া বুঝলো আমার চাকরি হয়েছে। ভাইয়া পরে বাড়িতে বলেছে। বাবা পরে ফোন দিয়েছে, বাপ ছেলে দুজনেই কাঁদছি অনেক্ষণ।
প্রাইমারি স্কুলের চাকরিটা আমার ত্রাতাই ছিলো। কিন্তু সন্তুষ্টি আর চাহিদাপূরণ কোনোটাই আসলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি জানি, আমার বেকার সময়ে এই চাকরি আমার জীবনে কতটা আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করতে গিয়ে আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আমার কলিগগণ আমাকে বেশ সহযোগিতা করেছে। বিশেষ করে বাবুল আহম্মেদ খান স্যার আমাকে বুদ্ধি, পরামর্শ দিয়ে সবসময় মানসিক চাপ কমিয়ে দিয়েছে। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
৪১তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল দিলো।রেজাল্ট দেখলাম। সেদিনও কাঁদলাম। কিন্তু কান্নাটা সেই ১৭ তারিখের মতো নয়। বুঝলাম, মানুষের অস্তিত্ব টিকে রাখার যুদ্ধসলিলে খড়কুটাও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৪১তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর অনলাইনে, অফলাইনে, বাড়িতে এসে আমাকে যারা শুভ কামনা জানিয়েছেন, সকলের প্রতি আমার ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা থাকলো।
যাক, সম্মান দানের মালিক মহান আল্লাহ, রিজিকের মালিকেও তিনি। তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি তার জন্য দোয়া চেয়ে লিখেন,
“সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। আমার দেশ, দেশের মানুষকে যেন আমার সর্বোচ্চ দিয়ে সেবা দিতে পারি”
© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।