লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ
নেপোলিয়ন বলেছিলেন, আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো। অথবা শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষা নিয়ে এমন অনেক প্রবাদ প্রবচনের সাথে আমরা বেশ পরিচিত, একবিংশ শতাব্দীতে এসে যদি কোন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলতার পরিচয় পাওয়া যায় সেটা অবাক করবে যে কাউকেই। ১৯৭৫ সালে দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৯৯৫ সালে ভবন তৈরির পর থেকেই এতে পাঠদান শুরু হয়,, তারপর বেশ নামডাক আর সুশৃঙ্খল ভাবেই চলছিলো এই বিদ্যালয়ের পড়াশোনা। ২০১১ সালের পর থেকে ভয়ানক ভাবে পালটে যেতে থাকে এই বিদ্যালয়ের ভেতরের আর বাইরের কর্মকাণ্ড। এই আশ্চর্য বিদ্যাপীঠের ব্যবচ্ছেদের শুরুটা হোক এই কথা দিয়ে, এখানে নাকি ম্যানেজিং কমিটির প্রধান জেলা প্রশাসক।
প্রশ্নটি মনে রাখুন? কোন কিছুর কমতি না থাকলেও এখানে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক,হাতে গোনা ৪/৫ জন শিক্ষক আর প্রধান শিক্ষকের মনগড়া ৭/৮ জন খন্ডকালিন শিক্ষক,যাদের শিক্ষকতা পেশায় খুব দাগ কেটেছে অনেক অবিভাবক ও অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের, যথেষ্ট অবাক করেছে এই বিষয়টি। একটি অভিযোগ শুনে নড়েচড়ে বসেছে অভিভাবক সহ সচেতন মানুষ তা হলো,দীর্ঘদিন থেকে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট আর খণ্ডকালীন শিক্ষক কে নিয়ে দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র রাকিব হোসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেজবুকে পোস্ট “দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রক্সি টিচারের কারখানা “
ফেজবুক পোষ্টে দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সকল খণ্ডকালীন শিক্ষক এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়, যদিও অনেকে এর পক্ষে, বিপক্ষে মন্তব্য প্রদান করেন,দহগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র আশরাফুল ইসলাম লিখেন,
“সবার আগে দহগ্রাম সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ঠিক বিদ্যালয়ের পরিবেশ ফিরে আনা দরকার,
আমার কাছে একটা ইনডিসিপ্লিন স্কুল হলো দহগ্রাম সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়। এই স্কুলের জন্য ডিসিপ্লিন শব্দটা সম্ভবত জাদুঘরে রাখা আছে।
শ্রদ্ধেয় শিক্ষক থেকে ছাত্রছাত্রী এমনকি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীগন নিয়মকানুনকে বরাবরই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়।
সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে একটা স্টুডেন্ট তার ক্লাস রুটিন সম্পর্কে জ্ঞাত না,কখন টিফিন হয় কখন স্কুল ছুটি হয় এটা তো সবার ইচ্ছেমত চলে।।
দুপুরে বঙ্গেরবাড়িতে প্রায়ই থাকি,দুপুর ১২ টার সময় অনেকে স্টুডেন্টকে দেখি স্কুল থেকে বাড়ি চলে যায়,আর স্কুল চলাকালীন সময়ে বঙ্গেরবাড়ি বাজারের হোটেলগুলোতে ছাত্রীছাত্রীদের অবাদ বিচরণ।
মনেহয় না এই বিদ্যালয়ে কোন একটা শ্রেণির একদিন সর্বোচ্চ ৪-৫ টি বিষয়ে পাঠদান হয়েছে,,একটা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় হলেও এই স্কুলের এসএসসির রেজাল্ট জঘন্য,,,, বাল্যবিবাহ নিয়ে এই স্কুলের শিক্ষক মহোদয়রা বরাবরই উদাসীন।
আমার মনেহয় প্রক্সি টিচারের বিষয়টির আগে এই বিদ্যালয়ের গুণগত মান নিয়ে আসাতে বেশি নজর দেওয়া দরকার”
ফেজবুক পোষ্টে দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আরেক প্রাক্তন ছাত্র হাবিব লিখেন, ”আমাদের সময়ের থেকে বর্তমান প্রজন্ম আরও ভালো দির্কনির্দেশনা পাচ্ছে বলে মনে হয়।
আমি ধন্যবাদ জানাই এলাকার বড় ভাই , বন্ধু ও জুনিয়রদের যারা নাম মাত্র বেতনে শ্রম দিচ্ছে ।
তারা এগিয়ে না গেলে শিক্ষার্থীদের অবস্থা আরও বেহাল হতে পারত।
কারণ আমরা ভালো জানি আমরা কি পেয়েছি বিদ্যালয় থেকে।
রাকিব হোসেন শ্রদ্ধেয় বড় ভাই, কোন বিদ্যালয়ে নিয়োগ নিতে হলে post creat থাকতে হয়, কিন্তু স্কুলে সেটা নেই।
আমাদের সাবেক প্রধান শিক্ষক নিজের আখের গুছানো নিয়া ব্যস্ত ছিলেন ।
আর এলাকার শ্রদ্ধেয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গদের এ বিষয়ে কোন মাথা ব্যাথা ছিল না।
আমরা দল কানা রাজনীতি আর গরুর কালোবাজারীর টাকা আর গরুর স্লিপ নিয়ে ব্যস্ত।
আমি সচারাচর এলাকার বিষয়ে কথা বলি না তবে আজ মনে হলো স্কুলের প্রক্সি শিক্ষকদের নিয়ে সবার ভুল ধারণাটা দূর হোক”
প্রাক্তন ছাত্র কালাম-আল-আজাদ লিখেন, “দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়,আমি কথা বললে সবার লাগে তাই বলিনা, সমাজ অবক্ষয়ের পিছনে মুলত শিক্ষকরাই দায়ি,জাতিগত ভাবে আমরা সময়ের মূল্য দিতে জানি না,একজন শিক্ষকের সময়মত স্কুলে আসা প্রয়োজন কিন্তু কজন শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসে?ছাত্র ছাত্রীদের কে সময়ের গুরুত্ব কি বোঝাবেন তারা যেখানে তারা নিজেই সময়মত নিজের কাজ করতে ব্যর্থ! শিক্ষক কত বড় সম্মানের পেশা ছিলো কিন্তু এখন তা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে?থাকলো বাকি প্রক্সি টিচার দের কথা,তারা তো নিজেদের প্রয়োজনে সেখানে যোগদান করেছেন,যার নাম প্রাইভেট বানিজ্য। নিজেদের প্রয়োজন টাই যেখানে প্রাধান্য পায় সেখানে শিক্ষা? ছাত্র ছাত্রীরা শুধু আনাকুম জানাকুম”
১৬ জুলাই ২০২৩ সকাল ১০টা, বিদ্যালয়টিতে ছাত্রছাত্রীদের বেশ ভিড়, বেলা ১১.৩০ টার সময়ও একই অবস্থা, ক্লাসের সময় ছাত্রছাত্রীরা বাইরে কাটাচ্ছে, বিদ্যালয়ের মাঠে জটলা পাকিয়ে বসে বসে গল্পে মত্ত ছাত্রছাত্রীরা, এই চিত্র প্রতিদিনের। বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা যখন ইচ্ছে আসছে আর বাড়ি চলে যাচ্ছে, এ যেন আসা যাওয়ার মিছিল। ৭ম শ্রেণীর এক ছাত্রকে ক্লাসের সময় মাঠের দক্ষিন দিকে ঘুরতে দেখা গেল, কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলাম, ক্লাসের সময় বাইরে কি কর? জবাবে বললো এখন ক্লাস নাই উল্লেখ্য যে তখন সময় ১২.৩০ মিনিট, আবার প্রশ্ন ছুড়লাম, তোমাদের ক্লাস রুটিনে এখন কি ক্লাশ? প্রশ্ন শুনে থতমত খেয়ে গেল, বলল ক্লাশ রুটিন কি তা আমি জানিনা, তাৎখনিক বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক মোঃ ফরিদুল ইসলামের অফিস কক্ষে গেলেও তাকে পাওয়া যাইনি, বাকিটা আপনারা বুঝে নিন। গত পরিক্ষায় ৯ম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পরে প্রশ্ন করলাম কি পরীক্ষা দিলা? বললো আইসিটি, বললাম আইসিটির ফুল মিনিং বলো?? বললো জানিনা। কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই চলছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দুঃখজনক হলেও সত্যি বিদ্যালয়টিতে বিজ্ঞান বিভাগ চালু থাকলেও শিক্ষকের অভাবে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়া মোট ৮ জন ছাত্রছাত্রীর ভাগ্য দুলছে বিধাতার হাতে,এ বিষয়ে কথা বললে প্রধান শিক্ষক পাটগ্রাম ইসলামি স্কুলে ক্লাশ করার কথা বলেছে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের, দুজন শিক্ষকের সাথে কথা বলেছি আর তাতেই তাদের অসহায়ত্ত চরমভাবে ফুটে উটেছে, যা লেখার উপযোগী মনে হয়নি। একটি প্রবাদ বেশ প্রচলিত, শিক্ষার জন্য এসো, সেবার জন্য ফিরে যাও, কিন্তু এখানে ঠিক উল্টো। ফাকিবাজির জন্য এসো, ব্যর্থতার জন্য বেড়িয়ে যাও। দহগ্রামের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা করছে, এমন কিছুতে অনুপ্রেরনা খোজার মত ছাত্রছাত্রীর বড় অভাব এই বিদ্যালয়ে। শুরুর দিকে একটা কথা বলেছি, এই বিদ্যালয়ের অভিভাবক জেলা প্রশাসক প্রশ্নটি মনে রেখেছেন? প্রশ্ন মনে রাখুন আর না রাখুন জেলা প্রশাসক অভিভাবক অথচো বিদ্যালয় থেকে আপনাদের ভবিষ্যত যে প্রজন্ম কিছুই শিখছে না এটাই মনে রাখুন। দক্ষিন আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যানডেলা বলেছেন, শিক্ষা হচ্ছে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। দহগ্রামে এই অস্ত্র তৈরির কারিগরের বড় অভাব, আপনাদের ছেলেমেয়েরা কি শিখছে সেদিকে নজর রাখুন, এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ভালো কিছু আশা করার আগে এর ভেতরের আর বাইরের বিষয়গুলোর পরিবর্তন করার জন্য জনমত গড়ে তুলতে আগ্রহী অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও দহগ্রামের সাধারণ মানুষ
© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।