প্রথম পর্ব
নরসিংদী প্রতিনিধি:
নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার হিসাব সহকারী মো. মাহমুদুল হাসান (সুমন)-এর বিরুদ্ধে জাল শিক্ষাসনদ ব্যবহার করে চাকরি গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের নির্দেশনায় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রম শুরুর পর তার বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। এবং এই ঘটনায় তদন্ত চলমান রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০২ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার একটি সাময়িক সনদ ব্যবহার করেন মাহমুদুল হাসান। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, একই রোল নম্বরের পরীক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ৪০৯ নম্বর পেয়ে তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। অভিযোগ রয়েছে, মূল সনদে কাটাছেঁড়া ও ঘষামাজা করে বিভাগ ও ফলাফল পরিবর্তন করে জাল সনদ তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে সেই সনদের ভিত্তিতেই ২০০৯ সালে মাধবদী পৌরসভায় হিসাব সহকারী পদে চাকরি লাভ করেন তিনি।
এদিকে, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে স্থানীয় ১০ জন পৌরবাসীর স্বাক্ষরযুক্ত একটি লিখিত অভিযোগ ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জমা দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি গ্রহণ, পৌরসভার বিভিন্ন খাত থেকে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ লোপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরিতে যোগদানের পর তৎকালীন মেয়র মোশাররফ হোসেন প্রধান মানিকের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে মাহমুদুল হাসান পৌরসভার আর্থিক কার্যক্রমে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন।চাকরিতে যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই মাহমুদুল হাসানের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। শৈশবে চরম আর্থিক সংকটে বেড়ে ওঠা এই কর্মকর্তা বর্তমানে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে তিনতলা বিলাসবহুল ভবনের মালিক। ভবনটি বর্তমানে ধনবাড়ী প্রি-ক্যাডেট ইনস্টিটিউটের কাছে মাসিক ৪০ হাজার টাকারও বেশি ভাড়ায় দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া নিজ গ্রাম হেরিনাতলীতে নির্মাণ করেছেন একটি বিলাসবহুল বাড়ি। অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি, দোকান ও একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন তিনি। এ কারণেই স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন ‘সুমন জমিদার’ নামে পরিচিত।
মাহমুদুল হাসানের ভবনে ভাড়া নিয়ে পরিচালিত ধনবাড়ী প্রি-ক্যাডেট ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক মো. ইউসুফ বলেন,”আমরা জানি তিনি একজন সরকারি চাকরিজীবী। তার পুরো ভবনটি আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ভাড়া নিয়েছি। প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকার বেশি ভাড়া পরিশোধ করা হয় এবং এ বিষয়ে আমাদের লিখিত চুক্তিও রয়েছে
লিখিত অভিযোগকারী রাজিব মিয়া বলেন,
“আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে ভুক্তভোগী। তাই বাধ্য হয়ে লিখিত অভিযোগ করেছি। আমাদের একটাই দাবি, তদন্ত যেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্তভাবে সম্পন্ন হয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
স্থানীয় বাসিন্দা আলী আহমেদ বলেন,”পৌরসভার সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছে। সরকারি অর্থের সঠিক হিসাব এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
অভিযোগকারী রাকিবুল মিয়া বলেন,”পৌরসভায় সাধারণ মানুষের কাজ করাতে অযথা হয়রানি করা হতো। অনিয়মের প্রতিবাদ করলে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি ও ভয়ভীতি দেখানো হতো।”
অভিযোগকারী রুবেল মিয়া বলেন,”অনেককে রাজনৈতিক পরিচয়ের অপবাদ দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। আমরা চাই, তদন্তে সব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হোক।”
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে মাহমুদুল হাসান ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন,”বিষয়টি তদন্তাধীন। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও পৌর প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলুন। তবে গোপনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে বিলাসবহুল বাড়ির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সেটি নিজের বলে স্বীকার করেন মাহমুদুল হাসান।
,”অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্তে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও বর্তামানে মাধবদী পৌরসভার প্রশাসক আসমা জাহান সরকার বলেন, “লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তদন্তে যে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা রাজিব মিয়াসহ ১০ জন পৌরবাসীর স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগপত্রে উত্থাপিত বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।