কোরবাণীর আহকাম ও মাসায়েল
কোরবানির আভিধানিক অর্থ উৎসর্গ, উৎকৃষ্ট,ত্যাগ, নিবেদন, নৈকট্য বা নৈকট্য লাভের মাধ্যম। কোরবানি বা উৎসর্গ প্রত্যেক ঐ বস্তু কে বলা হয় যা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হয়- সেটা কোন পশু জবাই হোক অথবা অন্য কোন বস্তুর সদকা হোক।
ইসলামী পরিভাষায় কোরবানির সংজ্ঞাঃ
নির্ধারিত নিয়মে নির্দিষ্ট পশুকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে আল্লাহর নামে জবাই করা।
কোরবানির নেসাবঃ
যে পরিমাণ সম্পদের উপর যাকাত ও সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হয় ঠিক ওই পরিমাণের উপর কুরবানি ওয়াজিব হয় উল্লেখ্য যে ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ ই জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য সম্পদের অতিরিক্ত (অর্থাৎ পরিধানের বস্ত্র বাসস্থান ও খাদ্যদ্রব্য ব্যতীত সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২তোলা রুপা অথবা এর সমপরিমাণ মূল্যের সম্পদ ঋণমুক্ত মালিক হওয়া
(কোরবানির নিসাব অর্থাৎ তার ওপরে কোরবানি ওয়াজিব)
কোরবানির পশুর বিবরণ ও মাসাআলাহ
১)ছাগল দুম্বা মেষ, গরু মহিষ উট কোরবানির জন্য প্রযোজ্য
২) পুর্ন এক বছরের কম বয়সের ছাগল দ্বারা কোরবানি করলে তা আদায় হবে না।
৩) দুম্বা মেষের বয়স ও এক বছর পুর্ন হওয়া শর্ত। তবে এক বছরের কম অথবা ছয় মাসের দুম্বা মেষ যদি দেখতে এক বছরের মনে হয় তবে এ দারাও কুরবানী আদায় হয়ে যাবে।
৪) গরু-মহিষের কোরবানির জন্য ২বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত, এর চেয়ে কম বয়সে জবাই করলে কুরবানী আদায় হবে না।
৫। উট কুরবানির উপযুক্ত হওয়ার জন্য পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত।
৬। কোরবানির পশু ক্রয় করার সময় যদি বিক্রেতা পূর্ণবয়স্ক বলে দাবি করে এবং দেখত ও সেরূপ মনে হয় তবে এ ধরনের পশু দ্বারা কুরবানী আদায় হয়ে যাবে।
৭) যেসব পশুর জন্ম থেকে শিং ওঠেনি অথবা অর্ধাংশ শিং ভেঙ্গে পড়েছে তার দ্বারা কুরবানী বৈধ হবে।
৮)যে পশুর এক-তৃতীয়াংশ কান অথবা লেজকাটা অথবা জন্মগতভাবেই কান নেই সে পশু দ্বারা কুরবানী হবে না।
৯) পশুর শিং গোড়া থেকে উপরে গেলে সে পশু দ্বারা কুরবানী জায়েজ হবে না।
১০) কোরবানির পশু ত এমন রোগাক্রান্ত অথবা এমন দুর্বল যে কোরবানির স্থান পর্যন্ত নিজ পায়ে হেঁটে যেতে পারে না এমন পশু দ্বারা কুরবানী করা হলে সে পশু দ্বারা কুরবানী হবে না।
১১) যে পশুর অধিকাংশ দাঁত নাই সে পশু দ্বারা কুরবানী জায়েজ হবে না
১২) ধনী ব্যক্তি কোরবানির পশু ক্রয় করার পর যদি এমন কোনো দোষ ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় যা দ্বারা কুরবানী বৈধ নয় তবে তার পরিবর্তে অন্য পশু কোরবানি করতে হবে।
১৩) যদি কেউ একথা মনে করে কোরবানি না করে যে, আমার পক্ষ থেকে আমার ভাই অথবা অন্য কেউ দান স্বরূপ কুরবানী করবে ,যদি এরূপ বাস্তবিকই হয় তাহলে ওয়াজিব কুরবানী আদায় হবে না
১৪) কারোর অনুপস্থিতিতে যদি অন্য কেউ তার পক্ষ থেকে বিনা অনুমতিতে কোরবানি করে তবে তা হবে না আর যদি কোন পশুর মধ্যে অনুপস্থিত কোন ব্যক্তির অংশ তার বিনা অনুমতিতে সাব্যস্ত করা হয় তবে অন্যান্য অংশীদার কোরবানিও সহীহ হবে না।
১৫) শরীকি কোরবানি দিলে প্রত্যেক শরীককেই ওজন করেই গোশত বন্টন করতে হবে ,অনুমান করে বন্টন করা বৈধ হবে না,
১৬) কোরবানির পশু ক্রয় করার পরে অন্য লোককে শরীক করলেও কুরবানী আদায় হয়ে যাবে কিন্তু উত্তম হচ্ছে পশু ক্রয় করার আগেই শরিক নির্ধারণ করা।
১৭) কোরবানি কাজর জন্য মজুরি দিয়ে লোক রাখা বৈধ ,এর জন্য বিনিময় হিসেবে গোসত দেওয়া জায়েজ হবে না, মজুরি দিতে হবে।
১৮) কুরবানী ( জবাই) করার বিনিময় চামড়া অথবা গোসল দেওয়া বৈধ নয় সেজন্য ভিন্ন মজুরি দিতে হবে
১৯) কোরবানির গোশত বন্টন পদ্ধতিঃ
কোরবানির গোশত কে তিন ভাগে ভাগ করা একভাগ নিজের জন্য এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য আর এক ভাগ দরিদ্রদের জন্য বিতরণ করা সুন্নত।
২০) পশুর যে মাংস খাওয়া নিষেধঃ
রক্ত, পুরুষাঙ্গ, অন্ডকোষ, স্ত্রী জননাঙ্গ ,প্রস্রাবের থলি, পিত্ত ,মাংসপেশি (অর্থাৎ ঐ সমস্ত এবং নরম গোশতের মধ্যে থাকে)
২১) কোরবানীর সাথে আকিকা করা প্রসঙ্গে-
কোরবানীর সাথে আকিকা করা জায়েজ আছে। যেহেতু কুরবানি ও আকিকার দোয়া ভিন্ন তাই যাবেহ করার সময় কোরবানি দেওয়ার সাথে আকিকার দোয়া পড়তে হবে। উল্লেখ থাকে যে কুরবাণী করতে হুকুম আকিকার গোশতের ও ঠিক একই হুকুম। শুধু কষ্ট বন্টন করতে পারেন অথবা রান্না করেও খাওয়াতে পারেন।
লেখকঃ
বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন মুফতি আশরাফুল ইসলাম, খুলনা